Wednesday, June 19, 2024

হাসান আজিজুল হকের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার

বছর দুই হতে চলল কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক আর শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই। মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাবের আগেও কী প্রবলভাবেই না তিনি বেঁচেবর্তে ছিলেন। শুধু যে নিজে বেঁচে ছিলেন তা-ই নয়, আমাদেরও বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। করোনার মধ্যে গৃহবন্দি হয়ে পড়ার পর তাঁর ছটফট করা মুহূর্তগুলো টের পেতাম তাঁর ঘন ঘন টেলিফোন কলের আহ্বান থেকে।

তাঁর বাসার আড্ডার নিয়মিত দুই অতিথি ছিলাম আমি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে তাঁর অনুজপ্রতিম সহকর্মী মহেন্দ্রনাথ অধিকারী। কেউই তখন তাঁর ডাকে সাড়া দিতে পারিনি করোনার নানা বিধি-নিষেধের কারণে। এসব তাঁকে এতটাই বিষণ্ণ করে তুলেছিল যে খুব দ্রুতই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। অনিবার্য ফলাফল হিসেবে ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যা রাতে পৃথিবীর সব কোলাহলকে বিদায় জানান ছোটগল্পের যুবরাজখ্যাত এই কথাসাহিত্যিক।
 
হাসান স্যার ছিলেন একজন আপাদমস্তক প্রাণচঞ্চল মানুষ। খুব রসিয়ে গল্প জমাতে পারতেন। আশির কোঠা পেরিয়ে গেলেও সবল ছিলেন, হাসি-আড্ডায় মাতিয়ে রেখেছিলেন ‘উজান’-এর সেই ছোট্ট ঘরটা। নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষকতাজীবনের শেষের দিকে বানান ‘উজান’ নামের বিখ্যাত এই বাড়িটি।
 
আমুদে এই মানুষটি সারাক্ষণ মানুষের মধ্যে থাকতে ভালোবাসতেন। আর ভালোবাসতেন বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকতে। দোতলাবিশিষ্ট উজানের নিচতলার দক্ষিণের ছোট্ট যে ঘরটায় তিনি জীবনের শেষ কিছু বছর কাটিয়েছেন লেখালেখি করে, বই পড়ে, আড্ডা দিয়ে, সেখানে চারদিকের দেয়ালজুড়ে শোভা পেত শুধু বই আর বই।

 

https://cdn.kalerkantho.com/public/news_images/share/photo/shares/1.Print/2023/11.November/10-11-2023/2/kalerkantho-sl-1a.jpg

বাড়ির দোতলায়ও ছিল বইয়ের কয়েকটি বিশাল র‌্যাক। আগে যখন দোতলায় ছিলেন তখন লেখাপড়ার ঘরটাও ছিল দোতলায়।

 
হাসান স্যারের ব্যক্তিগত সংগ্রহের সেসব বই পরে দোতলা থেকে নিচতলার ঘরটায় ঠাঁই করে নেয়। নিচতলার উত্তরের ঘরটায় দুপুরে খাবার পরে রবীন্দ্রসংগীত শুনতে শুনতে বিশ্রাম নিতেন, রাতে ঘুমাতেন। অসুস্থতার পুরোটা সময় এই ঘরেই কেটেছে তাঁর। এখানেই তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
দক্ষিণের পড়ার ঘরটায় একটা কাঠের টেবিলের কয়েক র‌্যাকও ভর্তি ছিল বইয়ে। এখানেই একটা কাঠের চেয়ারে বসে পড়তেন, ভাবতেন, লিখতেন। মাঝে মাঝে ঘরের এক কোণে রাখা আরাম কেদারায় সটান শুয়ে পড়তেন। অতিথিরা এলে এই ঘরেই তাঁদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠতেন কখনো কাঠের টেবিলটায় বসে, কখনো আরাম কেদারায় পিঠ এলিয়ে দিয়ে।
মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন এই ঘরটা সেভাবেই ছিল। সম্প্রতি সেই ঘর থেকে বইয়ের র‌্যাক, টেবিল সরিয়ে নিচতলার পশ্চিমে ড্রয়িংরুমে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি উজানে গিয়ে হাসান স্যারের বইয়ের সাম্রাজ্যে ঢুকতেই একটা শূন্যতা আমাকে গ্রাস করল। মনে পড়ে গেল, দক্ষিণের ঘরের দরজা ঠেলে উঁকি দিতেই টেবিলে নিমগ্ন হয়ে বসে থাকা হাসান আজিজুল হকের ঠোঁটে মুচকি হাসি খেলে যেত। সহাস্যে বলে উঠতেন, ‘এসো ব্যাকুল, এসো’। আমাকে বসিয়েই বাসার দীর্ঘদিনের গৃহসহকারী শাহিনাকে ডেকে এটা-সেটার বন্দোবস্ত করতে বলতেন।
হাসান স্যারের মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে অনেক দিন আর সে বাসায় যাওয়া হয়নি। কয়েক দিন আগে যখন গেলাম তখন আন্তরিকভাবেই স্বাগত জানালেন হাসান স্যারের বড় মেয়ে শুচি আপা, ছেলে মৌলি ও পুত্রবধূ মালা। মাঝে একবার এসে উঁকি দিয়ে গেলেন স্যারের ছোট মেয়ে তোতন। স্যারের কিশোর বয়সী নাতি অনিন্দ্য এসে শুনিয়ে গেল মা-বাবার সঙ্গে তার সাম্প্রতিক জাপান সফরের গল্প।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রির প্রফেসর মৌলি জানালেন, স্যারের সেই পড়ার ঘরটায় এখন তোতন থাকে। সেখানকার সব বই, দোতলার বইগুলো সব সাজিয়ে রাখা হয়েছে ড্রয়িংরুমে। হাসান স্যারের সংগ্রহের বেশির ভাই বই উপহার হিসেবে পাওয়া।
এর বাইরে নিজেও বই কিনতেন। আমি নিজে কলকাতা গিয়ে তাঁর জন্য অনেক বই কিনে এনেছি। হাসান আজিজুল হকের লেখা পড়লে পাঠক বুঝবেন না তিনি মনের দিক থেকে কতটা শিশুসুলভ ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শিশুসাহিত্যের ভক্ত পাঠক ছিলেন। বর্ধমানে ছেলেবেলায় স্কুলের লাইব্রেরি থেকে নিয়ে পড়া দেব সাহিত্য কুটিরের অনেক শিশুতোষ বই খুঁজে খুঁজে কিনতেন। আমি কলকাতায় গেলে তালিকা ধরিয়ে দিয়েছেন- দেব সাহিত্য কুটিরের ‘গোয়েন্দা গল্প’, ‘শিশুতোষ গল্প’, ‘পরশুরামের হাসির গল্প’। আমি বেশ কয়েকবার এমন কিছু বই এনে দিয়েছি। আবার দে’জ পাবলিশার্স থেকে স্যারের লেখার রয়্যালটি নিতে গেলে তারাও স্যারের জন্য কিছু বই আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন।
হাসান আজিজুল হকের বইয়ের সাম্রাজ্যে বইয়ের তালিকা করা রীতিমতো দুরূহ। বিষয়, লেখক, প্রকাশের স্থান- যে ক্যাটাগরিতেই ফেলা হোক না কেন তার পরিসর এত বিস্তৃত যে সে তালিকা না করাই ভালো। মৌলির হিসাবে, সব মিলিয়ে কমপক্ষে হাজার ছয়েক বই আছে স্যারের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে। শুধু এটুকু বলাই সংগত হবে যে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা, স্মৃতিকথা, স্মারকগ্রন্থ, পত্রপত্রিকা, সাময়িকী, অভিধান, ব্যাকরণ- সব ধরনের বইপত্রের সমারোহ রয়েছে তাঁর গ্রন্থাগারে। যে বইগুলো সব সময় হাতের কাছে রাখতে চাইতেন সেগুলো তাঁর টেবিলের র‌্যাকে রাখতেন। ঢাকার পাঠক সমাবেশ প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রসমগ্র’র সবগুলো খণ্ড তাঁর পড়ার টেবিলের র‌্যাকেই থাকত। রবীন্দ্রনাথের জীবনীগ্রন্থ ‘রবিরশ্মি’ও দেখেছি র‌্যাকে। থাকত বাংলা, ইংরেজি অভিধান, বিশ্বখ্যাত ইংরেজি গল্পের সংকলন। এখনো সেভাবেই রাখা আছে।
হাসান আজিজুল হকের প্রকাশিত গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধগ্রন্থের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তিনি লিখতেন খুব কম, যা লিখতেন তার ওজন ছিল। তিনি তেমন বিরল লেখকদের একজন, যিনি এক শরও কম ছোটগল্প আর মাত্র কয়েকটা উপন্যাস, প্রবন্ধগ্রন্থ লিখে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন। তবে বাংলাদেশে বা কলকাতা থেকে তাঁর বইগুলোর কত রকম সংস্করণ যে বেরিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
সব মিলিয়ে হাসান আজিজুল হকের এমন বইয়ের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত যে গ্রন্থাগার তাতে এতগুলো র‌্যাক থাকলেও কোনো একটা র‌্যাকে তাঁর সবগুলো বই পাশাপাশি সাজিয়ে রাখা নেই। এর কারণ জানালেন ছেলে মৌলি- ‘আব্বাকে বহুবার বলেছি বইগুলো গুছিয়ে রাখি। তিনি বরাবরই তাতে পাত্তা দিতেন না। বলতেন, থাকুক না আমার বইগুলো নানা ধরনের লেখকদের সাথে মিলেমিশে।’ সম্প্রতি যখন বইগুলো নতুন করে সাজিয়ে রাখা হলো তখনো মৌলির ইচ্ছে হয়েছিল বাবার বইগুলো এক জায়গায় গুছিয়ে রাখতে। কিন্তু বাবার সেই কথা মনে পড়ায় আর সেদিকে এগোননি তিনি।
হাসান আজিজুল হকের টেবিলের ড্রয়ারজুড়ে থাকত পছন্দের নানা রকম ঝর্ণা কলম। পার্কার কলম ছিল হাসান স্যারের খুব প্রিয়। মৌলি ড্রয়ার খুলে দেখালেন এখনো ড্রয়ারে পার্কারসহ অনেকগুলো কলম রাখা আছে। টেবিলের ওপরেই রাখা আছে সেই কলমে লেখার জন্য ‘সুলেখা কালি’। এসব এখন শুধুই স্মৃতি। সৃষ্টিশীল, আড্ডাবাজ মানুষটা আজ চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ছায়াসুশীতল আঙিনায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর গোলাম সাব্বির সাত্তারের সহযোগিতায় তাঁকে এমন সম্মানজনক স্থানে সমাহিত করতে পেরেছিলাম আমরা। উপাচার্য স্যার গত বছর হাসান স্যারের সমাধিটা খুব সুন্দর করে বাঁধাই করে দিয়েছেন। ২ ফেব্রুয়ারি জন্মদিন, ১৫ নভেম্বর মৃত্যুদিনে ফুলে ফুলে ভরে যায় সেই সমাধির বেদি। এবারও নিশ্চয় সবাই সেভাবেই স্মরণ করবে আমাদের সময়ের অন্যতম সেরা এই কথাসাহিত্যিককে। তা তো হবেই, তাঁর কাছে যে আমাদের ঋণের শেষ নেই!
spot_imgspot_img

দেশের উপকূলে সেরা সব সমুদ্র সৈকত

সমুদ্র তটরেখার দেশ বাংলাদেশ। এ দেশ অপরূপ এক বদ্বীপ। আর এই বদ্বীপের জন্য প্রকৃতির আশীর্বাদ বঙ্গোপসাগর। সাগরের নোনা জলে অনেক কিছু পেয়েছে এদেশের মানুষ।...

‘ফুরমোন পাহাড়’ পর্যটকদের মুগ্ধ করছে

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাহাড়ি জেলা রাঙ্গামাটি। যেটি রূপের রানী নামে খ্যাত। পাহাড়, মেঘ, ঝিরি-ঝর্ণা, আঁকাবাঁকা পথের সঙ্গে মিশে আছে সুবিশাল মিঠাপানির কাপ্তাই হ্রদ। শহরে...

রাখাইনের সহিসংতা নৃশংসতার দিকে চলে যেতে পারে: যুক্তরাষ্ট্র

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা এবং আন্তঃসাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্র মঙ্গলবার এ কথা জানিয়ে বলেছে, রাখাইনের সহিসংতা নৃশংসতার দিকে চলে যেতে পারে। নভেম্বরে...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here