Saturday, June 22, 2024

আমাদের উষ্ণ হৃদয় বন্ধু

 

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জন্মদিন আজ। তিনি ১৯১৭ সালের ১৯ নভেম্বর এলাহাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ও মা কমলা নেহরু। পারিবারিক নাম ইন্দিরা নেহরু। ডাক নাম ইন্দু। শান্ত নিকেতনে লেখাপড়ার সময় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নামের শেষে যোগ করেন প্রিয়দর্শিনী। কবিগুরু তাকে ডাকতেন ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নামে। ফিরোজ গান্ধীর সঙ্গে বিয়ের সূত্রে তার নাম হয় ইন্দিরা গান্ধী। এ নামেই তিনি সবার কাছে পরিচিত।

কংগ্রেসের প্রবীণ ও চতুর নেতারা চেয়েছিলেন তাকে পুতুল হিসেবে ক্ষমতায় বসিয়ে কলকাঠি নিজেদের হাতে রাখতে। কিন্তু তিনি তাদের স্বপ্ন উড়িয়ে দিয়ে হয়ে ওঠেন ‘ভারত-মাতা’। তিনি ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। আধুনিক বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান তিনি। দীর্ঘ ১৫ বছর তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার ব্যক্তিত্ব ছিল কোমলে কঠোরে অনন্য। তিনি বহুবার বিপদ ও সংকটে পড়েছেন, কারাবন্দি হয়েছেন। অনেক বিরূপ সমালোচনার মুখে পড়েছেন। স্বজন বিয়োগের বহু শোক তাকে বিধ্বস্ত করেছে। কিন্তু বৈরী পরিস্থিতির কাছে তিনি কখনোই আত্মসমর্পণ করেননি, নত হননি। সাহসিকতার সঙ্গে তিনি সেসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। অসাধারণ ব্যক্তিত্বপূর্ণ এই মহীয়সী নারী তার নেতৃত্বে ভারতকে নানাভাবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করেছেন। তিনি ছিলেন ভারতের লৌহমানবী। আর গোটা বিশ্বে তিনি খ্যাত একজন মহান ‘রাষ্ট্রনায়ক’ হিসেবে। তার শাসনামলে ভারত দক্ষিণের বিশেষভাবে এশিয়ার রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামরিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনেও রয়েছে তার অসামান্য অবদান।

 

ইন্দিরা গান্ধী আমাদের উষ্ণ হৃদয় বন্ধু, আমাদের স্বজন, আমাদের কাছের মানুষ। যেমনি ভৌগোলিক দিক থেকে তেমনি আত্মিক দিক থেকে। ’৭১-এ আমাদের মুক্তিসংগ্রামের সময় ক্ষমতাসীন ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে তিনি সর্বোতভাবে সহযোগিতা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর এদেশের প্রথম রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে তিনি এসেছিলেন ঢাকায়। বক্তব্য রেখেছিলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। যেখানে আত্মসমর্পণ করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সে সময় অনেকেই তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, সামনাসামনি। সে এক দুর্লভ ঘটনা। অনেকেই এ ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন। দীর্ঘ ৯ মাস বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সফল করতে অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যে বিদেশি রাষ্ট্রনেতা সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তিনি ইন্দিরা গান্ধী। তখন শক্তিশালী আমেরিকা ও চীন ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। ইন্দিরা গান্ধী প্রথমে সরাসরি পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে না জড়িয়ে বাংলাদেশে দখলদার বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন ও শরণার্থী সমস্যাটি বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরেন। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে ইউরোপ ও আমেরিকায় ঝটিকা সফর করেন। এদিকে দেশে শরণার্থীদের ভরণ-পোষণেরও দায়িত্ব নেন। মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের বিপুলসংখ্যক অস্ত্রশস্ত্র আর বিশাল সেনাবাহিনী ছিল। বাংলাদেশের যুদ্ধ করতে চাওয়া মানুষগুলোকে ভারতে গেরিলা প্রশিক্ষণ দিতে ইন্দিরা গান্ধী সহায়তা করেন। তাদের সরবরাহ করেন অস্ত্র। রাশিয়াও এ ক্ষেত্রে সাহায্য করে তাকে। মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণ দেওয়া আর অস্ত্রের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য তিনি খরচ করেন প্রায় ৭ হাজার কোটি রুপি। ইন্দিরা গান্ধী নিজের সৈন্যদের পাঠিয়ে দেন বাংলাদেশকে সাহায্য করতে। পাঠিয়েছেন বিমানবাহিনী।

একাত্তরের ৩১ মার্চ তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতার জন্য ভারতীয় লোকসভায় প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ৭ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামীদের জন্য আশ্রয় ও রাজনৈতিক কাজ পরিচালনার সুযোগসহ সার্বিক সাহায্য দেওয়ার আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেন। মুজিবনগর সরকার গঠন হলে বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানিদের গণহত্যার বিষয়টি তুলে ধরেন। পাকিস্তানি হত্যাযজ্ঞ বাড়তে থাকায় ভারতে শরণার্থীও বাড়তে থাকে। এ প্রসঙ্গ টেনে তিনি পাকিস্তানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভারতের পক্ষে চুপ করে থাকা সম্ভব নয়। এরপর সম্মিলিত বিরোধী দলের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন এবং বাংলাদেশের ও মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহায়তার সিদ্ধান্ত নেন।
 

ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালের ১৩ মে বেলগ্রেডে বিশ্বশান্তি কংগ্রেসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বক্তৃতা করেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মে মিশরের প্রেসিডেন্ট সাদাতকে চিঠি দেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। আগস্ট মাসের ১১ তারিখে বিশ্বের ২৪টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে শেখ মুজিবের জীবন রক্ষার্থে আবেদন করেন ইন্দিরা। একাত্তরের ১৭ আগস্ট বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানের কাছে পাঠানো বাণীতে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাময়িক আদালতে শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন বিচার শুরু করতে যাচ্ছেন বলে যে বিবৃতি দিয়েছেন, তাতে ভারত সরকার ও জনগণ এবং আমাদের সংবাদপত্রগুলো ও পার্লামেন্ট ভীষণভাবে বিচলিত হয়ে পড়েছে। এই বিচারে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য শেখ মুজিবকে বিদেশি আইনজ্ঞের সহায়তা নেওয়ার সুযোগও দেওয়া যাবে না। আমরা মনে করি, তথাকথিত এই বিচার শুধু শেখ মুজিবকে হত্যার জন্যই হবে। এই বিচারের ফলে পূর্ব বাংলার পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে এবং আমাদের দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র অনুভূতির ফলে ভারতেও একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। সেজন্যই আমাদের গভীর দুশ্চিন্তা। এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার বৃহত্তর স্বার্থে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যাতে একটি বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন, সে ব্যাপারে প্রভাব খাটানোর জন্য আমরা আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি।’

ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালের ৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাপারে বৈঠক করেন। এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর মস্কো বৈঠকে যুক্ত ইশতেহার পাঠ এবং মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেন। তার আন্তর্জাতিক তৎপরতার জন্য বহু দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

লেখক: সাংবাদিক

 
 
 
 
 
 
spot_imgspot_img

ইতালিপ্রবাসীদের জন্য সুখবর দিল ভিএফএস

ভিএফএস গ্লোবালের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে ভিএফএস গ্লোবাল। এবার তারা ইতালিপ্রবাসীদের জন্য সুখবর নিয়ে এসেছে। ভিএফএস তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেজের মাধ্যমে...

জেলখানার চিঠি বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাস  কয়েদি নং: ৯৬৮ /এ  খুলনা জেলা কারাগার  ডেথ রেফারেন্স নং: ১০০/২১ একজন ব্যক্তি যখন অথই সাগরে পড়ে যায়, কোনো কূলকিনারা পায় না, তখন যদি...

কর্মসৃজনের ৫১টি প্রকল্পে নয়ছয় মাগুরায়

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ের ৫১টি প্রকল্পের কাজে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পে হাজিরা খাতা না...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here