Wednesday, June 19, 2024

সেলুনের শেলফে বইয়ের বর্ণালি

বিশ্বায়নের যুগ, সামাজিক পরিসর বড় হচ্ছে, অবশ্য রাষ্ট্রভেদে। দৃশ্যত সমাজের সবকিছুর বিস্তার ঘটছে। যেমন শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু দিন দিন বই পড়ার প্রবণতা কমছে। শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞানচর্চার ঘাটতির বিতর্ক দীর্ঘদিনের। একসময় শ্রেণিকক্ষের বাইরেও বই পড়ার চর্চা ছিল। গ্রামবাংলায় ছিল পাঠাগার আন্দোলন। সেসব এখন অতীত।

বিশ্বব্যাপীস্বদেশেও বটে, বইবিমুখতার মধ্যেও কিছু মানুষ আলো ছড়াচ্ছেন। বই পড়ার আন্দোলনকে আবারও উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন। তাদের একজন গোলাম মাওলা জসিম। বই পড়ার অভ্যাসকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তার প্রচেষ্টার নাম ‘সেলুন পাঠাগার বিশ্বজুড়ে’। পৃথিবীর যেসব স্থানে বাংলা ভাষাভাষী রয়েছেন, সেই সব স্থানে তিনি বই পৌঁছে দিতে চান।

 

‘সেলুন পাঠাগার’ শব্দগুচ্ছ নতুন। উদ্যোগটিও অভিনব। চুল-দাড়ি কাটাতে সবাইকে সেলুনে যেতে হয়। অনেকে নিয়ম করে সেলুনে যান। গেলেই যে সঙ্গে সঙ্গে কাজ হয়ে যায় তা কিন্তু নয়। সেলুনে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, কখন সিরিয়াল আসবে, কখন নরসুন্দরের হাত ফাঁকা হবে। এ সময়টুকু বন্দিদশার মতো কাটে। এ জন্য আগে অধিকাংশ সেলুনে পত্রিকা রাখা হতো। সেলুন সাজানো হতো  পত্রিকার বর্ণালি পাতা দিয়ে। এখন আর পত্রিকা দেখা যায় না, সেলুনের বিশেষ সজ্জাও চোখে পড়ে না। ঢাকায় তো নয়ই, মফস্বলেও নয়। এখন সময় কাটাতে মোবাইল ফোনের স্ক্রলিং এই প্রজন্মের একটা ভালো বিকল্প। যারা এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন, তাদের সময়টুকু বইয়ের পাতায় নিবিষ্ট হয়ে কাটানোর ব্যবস্থা করেছেন গোলাম মাওলা।

দেশ-বিদেশের সেলুনে সেলুনে ছোট ছোট পাঠাগার গড়ে তুলছেন তিনি। সেখানে বই পড়তে পারবে মানুষ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের দুই শতাধিক সেলুনে পাঠাগার গড়ে তুলেছেন তিনি। নোয়াখালীর মাইজদিতে শুরু হওয়া এই পাঠাগার অভিযান কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে পৌঁছেছে ভারতেও।

নোয়াখালীর মাইজদি সদর উপজেলার লক্ষ্মীনারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা গোলাম মাওলা বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রামে। সেখান থেকেই উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। স্নাতকোত্তর করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

অল্প বয়স থেকেই বইয়ের প্রতি টান তার। মানুষকে বইমুখী করে তুলতে ২০১৮ সালে সেলুনে পাঠাগার তৈরির উদ্যোগ নেন। বিভিন্ন সেলুনে গিয়ে তাকসহ বই উপহার দেন। পাঠাগারে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যগ্রন্থ ক্ষণিকা থেকে শুরু করে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস লালসালু। দীনবন্ধু মিত্রের সামাজিক নাটক নীল দর্পণ, জহির রায়হানের রচনাসমগ্র, সোভিয়েত সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির পৃথিবীর পথে সবই মিলবে এই ছোট্ট তাকে।

পেশায় ব্যবসায়ী গোলাম মাওলা জসিম লেখালেখির সঙ্গেও জড়িত। কয়েকটি বইও বেরিয়েছে। তার সেলুন পাঠাগারের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে। দিন যত যাচ্ছে সেলুন পাঠাগারের পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে। নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের দুই শতাধিক সেলুনে শোভা পাচ্ছে পাঠক-সমাদৃত বই, দৃষ্টিনন্দন শেলফে। এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন সেলুনে আসা মানুষেরা এবং সেলুনের মালিক ও কর্মীরা।

সেলুন পাঠাগারের স্লোগান ‘অবসরে বই পড়ুন’। এই স্লোগান উদ্যোক্তা ছড়িয়ে দিতে চান বিশ্বজুড়ে। এর শুরু ২০১৮ সালের ৩০ জুন। নোয়াখালীতে রতনের সেলুনে বই ও আলমারি বিতরণের মাধ্যমে শুরু হওয়া এ কার্যক্রম এখন দেশের গন্ডিও পেরিয়েছে।

সেলুন পাঠাগার স্বচক্ষে দেখতে সম্প্রতি রাজধানীর মালিবাগের মেনস ন্যাচারাল পারলার নামের একটি সেলুনে যাওয়া। বাইরে থেকে এক কক্ষের একটি সেলুন মনে হলেও এর ভেতরে আলোর বর্ণালি। সেখানে একটি শেলফে বই রাখা হয়েছে। গল্প, কবিতা, উপন্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের বই। শফিকুল ইসলাম এই সেলুনের মালিক। সেলুনে বই পড়ার সুবিধা চালুর বিষয়টির প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় সেলুনে ভিড় থাকে, তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাস্টমারদের বসে থাকতে হয়। বই পড়ার সুবিধা চালুর পর ভালোই হয়েছে। অনেকেই এসে বই পড়ে, নেড়েচেড়ে দেখে। উদ্যোগটি প্রশসংনীয়।’

উদ্যোক্তা বলছেন, ভারতের কলকাতা ও আগরতলার ১০টি সেলুনে পাঠাগার বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরে আরও ১২টি সেলুনে রয়েছে ‘সেলুন পাঠাগার’।

রাজধানীর মিরপুর-১, মিরপুর-২, হাতিরপুল, কাঁটাবন, বাড্ডা, সেগুনবাগিচা, মালিবাগ, কাকরাইল, পুরান ঢাকা, ফার্মগেট, হাতিরঝিলসহ বেশ কয়েকটি স্থানে সেলুনে পাঠাগার উদ্বোধন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে বাজারে ছড়িয়ে গেছে সেলুন পাঠাগার। শুধু নোয়াখালীতেই প্রায় ১০০ সেলুনে পাঠাগার হয়েছে।

বই পড়ার মাধ্যমে নতুন নতুন স্বপ্ন তৈরি হয়। কাজ করার মানসিকতা তৈরি হয়, ধৈর্যশক্তি বাড়ে। নিজেকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে কাজের সন্ধানে বের হয় পাঠকরা। অলস সময় কাটাতে মন চায় না। অথচ বইকে আমাদের যত উপেক্ষা। এ পরিস্থিতি গোলাম মাওলা জসিমকে পীড়া দেয়। এ জন্যই এই উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানান তিনি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বইয়ের আলো নানা কারণে নিবু নিবু। তবে এ আলো কখনোই নিভে যায়নি, যাবেও না। কারণ জসিমের মতো নিভৃতচারীরা আলোর উৎস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

spot_imgspot_img

দেশের উপকূলে সেরা সব সমুদ্র সৈকত

সমুদ্র তটরেখার দেশ বাংলাদেশ। এ দেশ অপরূপ এক বদ্বীপ। আর এই বদ্বীপের জন্য প্রকৃতির আশীর্বাদ বঙ্গোপসাগর। সাগরের নোনা জলে অনেক কিছু পেয়েছে এদেশের মানুষ।...

‘ফুরমোন পাহাড়’ পর্যটকদের মুগ্ধ করছে

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাহাড়ি জেলা রাঙ্গামাটি। যেটি রূপের রানী নামে খ্যাত। পাহাড়, মেঘ, ঝিরি-ঝর্ণা, আঁকাবাঁকা পথের সঙ্গে মিশে আছে সুবিশাল মিঠাপানির কাপ্তাই হ্রদ। শহরে...

রাখাইনের সহিসংতা নৃশংসতার দিকে চলে যেতে পারে: যুক্তরাষ্ট্র

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা এবং আন্তঃসাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্র মঙ্গলবার এ কথা জানিয়ে বলেছে, রাখাইনের সহিসংতা নৃশংসতার দিকে চলে যেতে পারে। নভেম্বরে...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here