Saturday, June 22, 2024

ধনসম্পদে বরকত নষ্টের কারণ

এ যুগের ব্যস্ততা, জীবনের নানাবিধ চাপ এবং নিত্যনতুন চাহিদার আলোকে, অনেকেই বরকত থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করে থাকেন, যা পার্থিব জীবন উপভোগের জন্য একটি প্রয়োজনীয় বিষয়; যাতে এর সুফল বৃদ্ধি ও পরিলক্ষিত হয়। তাইতো যখনই কোনো কিছু থেকে বরকত উঠিয়ে নেওয়া হয়, তখনই এর উত্তম ফল ও ব্যাপক উপকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। বরং যখন কোনো কিছু থেকে বরকত উঠিয়ে নেওয়া হয়, তখন তাতে কষ্ট ও দুর্ভোগ নেমে আসে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘অনাবৃষ্টি দুর্ভিক্ষ নয়। বরং দুর্ভিক্ষ কেবল বৃষ্টি হতে থাকবে, বৃষ্টি হতে থাকবে। ফলে ভূমি কোনো কিছুই উৎপন্ন করবে না।’ -সহিহ মুসলিম : ৭০২৭

তাই কল্যাণপ্রাপ্ত ব্যক্তি বরকত অবতীর্ণ ও আগমনের কারণগুলো অনুসন্ধান করে এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে তা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা করে; যাতে এর উপকারিতা ও কল্যাণ বৃদ্ধি পায় এবং এর মাধ্যমে একটি সুন্দর জীবন লাভ করা যায়।

কাজেই মানুষকে যা দেওয়া হয়েছে তাতে বরকত লাভের মাধ্যমে মানসিক অস্থিরতা ও সম্ভাব্য ভয়ের বিপদ দূরীভূত হয়; তার ফলে মনের শান্তি ও আরাম, এবং অন্তরের তৃপ্তি ও সুখ অর্জিত হয়।

মানবজীবনে বরকত লাভ এবং কল্যাণ ও সুখার্জনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো- সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালার আনুগত্যের ওপর অবিচলতা, তার শরীয়ত পালন এবং তার বিধিবিধান মেনে চলা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি সেসব জনপদের অধিবাসীরা ইমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।’ -সুরা আল আরাফ : ৯৬

বরকতের শাব্দিক অর্থ প্রবৃদ্ধি। আর বরকতের মূল হচ্ছে- কোনো কিছু নিয়মিত থাকা। ‘আসমান ও জমিনের সমস্ত বরকত খুলে দেওয়া’ বলতে উদ্দেশ্য হলো- সবরকম কল্যাণ সবদিক থেকে খুলে দেওয়া।

পৃথিবীতে বরকতের বিকাশ ঘটে দুইভাবে। কখনো মূল বস্তুটি প্রকৃতভাবেই বেড়ে যায়। যেমন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুজেজাসমূহের মধ্যে রয়েছে একটা সাধারণ পাত্রের পানি দ্বারা গোটা কাফেলার পরিতৃপ্ত হওয়া। কিংবা সামান্য খাদ্যদ্রব্যে বিরাট সমাবেশের পেটভরে খাওয়া যা সঠিক ও বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে। আবার কোনো কোনো সময় মূল বস্তুতে বাহ্যত কোনো বরকত বা প্রবৃদ্ধি যদিও হয় না, পরিমাণে যা ছিল তাই থেকে যায় কিন্তু তার দ্বারা এতবেশি কাজ হয় যা এমন দ্বিগুণ, চতুর্গুণ বস্তুর দ্বারাও সাধারণত সম্ভব হয় না।

পক্ষান্তরে বরকত উঠে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, হারাম কর্মকান্ডের বিস্তৃতি এবং অনবরত পাপাচার ও খারাপ কাজে লিপ্ত থাকা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সাগরে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে; ফলে তিনি তাদের তাদের কোনো কোনো কাজের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ -সুরা আর-রুম : ৪১

অর্থাৎ স্থলে-জলে তথা সারা বিশ্বে মানুষের কুকর্মের বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। ‘বিপর্যয়’ বলে দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অগ্নিকাণ্ড, পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার ঘটনাবলির প্রাচুর্য, সবকিছু থেকে বরকত উঠে যাওয়া, উপকারী বস্তুর উপকার কম এবং ক্ষতি বেশি হয়ে যাওয়া ইত্যাদি আপদ-বিপদ বোঝানো হয়েছে। বিষয়টি অন্য এক আয়াতে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের যেসব বিপদাপদ স্পর্শ করে, সেগুলো তোমাদেরই কৃতকর্মের কারণে। অনেক গোনাহ তো আল্লাহ ক্ষমাই করে দেন।’-সুরা আশ-শুরা : ৩০

বরকত উঠিয়ে নেওয়ার প্রভাবগুলোর অন্যতম হলো- বর্তমান বিশ্ব আজ বিপুল সক্ষমতা ও অঢেল অর্থ থাকার পরও বিশাল অর্থনৈতিক সমস্যা এবং বিরাট আর্থিক চ্যালেঞ্জে ভুগছে। তা সত্ত্বেও, বিশ্ব বিপজ্জনক মুদ্রাস্ফীতি, অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি এবং বিপুল ঋণের বোঝায় জর্জরিত! এসব কিছুর কারণ হলো, অধিকাংশ মানুষের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পথ থেকে দূরে থাকা, তার হুকুম না মানা। অথচ মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্য এসব পছন্দ করেছেন এবং এটাকে তাদের পার্থিব ও পরলৌকিক সফলতার মাধ্যম বানিয়েছেন।

আরেকটি কারণ হলো- সুদি লেনদেনের বিস্তার, যার ওপর আজ বিশ্ব অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, যা তাদের অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং নানাবিধ সামাজিক সমস্যার সম্মুখীন করছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহতয়ালা সুদকে বিলুপ্ত করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন।’ -সুরা আল-বাকারা : ২৭৬

সুদকে মেটানো এবং দান-সদকাকে বাড়ানো আখেরাতে তো হবেই, কিন্তু এর কিছু কিছু লক্ষণ দুনিয়াতেও প্রত্যক্ষ করা যায়। যে সম্পদের সঙ্গে সুদ মিশ্রিত হয়ে যায়, অধিকাংশ সময় সেগুলো তো ধ্বংস হয়ই, অধিকন্তু আগে যা ছিল, তাও সঙ্গে নিয়ে যায়। সুদ ও জুয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই এরূপ ঘটনা সংঘটিত হতে দেখা যায়। অজস্র পুঁজির মালিক কোটিপতি দেখতে দেখতে দেউলিয়া ও ফকিরে পরিণত হয়। তাই তো হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সুদ যদিও বৃদ্ধি পায় কিন্তু এর শেষ পরিণতি হচ্ছে স্বল্পতা।’ -মুসনাদে আহমাদ : ১/৩৯৫

বাণিজ্যিক জালিয়াতি আজকের বিশ্বে এমন আকারে বৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যময় হয়েছে যার প্রকার ও ধরনের কোনো শেষ নেই, যা বিভিন্ন আর্থিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং আর্থিক লেনদেনকে মন্দা ও ধ্বংসের দিকে পরিচালিত করেছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ক্রেতা-বিক্রেতা বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের উভয়ের ইখতিয়ার (ইচ্ছাধীন) থাকবে। যদি তারা উভয়ে সত্য কথা বলে ও (পণ্যের দোষত্রুটি) যথাযথ বর্ণনা করে তবে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত হবে, আর যদি তারা মিথ্যা বলে ও (দোষ) গোপন করে, তবে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বরকত বিনষ্ট হয়ে যাবে।’ -সহিহ মুসলিম

সম্পদে বরকত নষ্ট হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, পণ্যের প্রচারের জন্য মিথ্যা শপথ করা এবং এ জাতীয় সবকিছু এর অন্তর্ভুক্ত হবে, যেমন- বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে পণ্যের গুণাগুণ মিথ্যাভাবে উপস্থাপন করা, মানুষকে ধোঁকা দেওয়া, যেমনটি আজ ব্যাপকভাবে যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে লক্ষণীয়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মিথ্যা শপথ পণ্য চালু করে দেয় বটে, কিন্তু বরকত নিশ্চিহ্ন করে দেয়।’ -সহিহ বোখারি ও মুসলিম

ব্যক্তিগত ও সরকারি সম্পদে বরকত নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে- লুণ্ঠন, ডাকাতি, কারসাজি এবং বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে সরকারি তহবিল নিয়ন্ত্রণ করা, যার প্রভাব গ্রহীতা এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের ওপর ক্ষতিকর। আর তাই হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন. ‘এই সম্পদ শ্যামল সুস্বাদু। যে ব্যক্তি প্রশস্ত অন্তরে (লোভ ছাড়া) তা গ্রহণ করে তার জন্য তা বরকতময় হয়। আর যে ব্যক্তি অন্তরের লোভসহ তা গ্রহণ করে তার জন্য তা বরকতময় করা হয় না। যেন সে এমন ব্যক্তির মতো, যে খায় কিন্তু তার ক্ষুধা মেটে না।’ -সহিহ বোখারি ও মুসলিম

জনসাধারণের টাকা সাগ্রহে, আকাক্সক্ষা, লোভ ও লিপ্সার সঙ্গে নেওয়া ব্যক্তির অবস্থা যদি এমন হয়, তবে যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে তা গ্রহণ করে তার অবস্থা কেমন হবে?

বরকত নষ্ট হওয়া ও সমাজে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটার আরেকটি কারণ হচ্ছে, অন্য মানুষের অর্থের সঙ্গে কারসাজি। যেমন- বিক্রয় মূল্য পরিশোধ না করা অথবা ঋণ ফেরত বা পারিশ্রমিক না দেওয়া ইত্যাদি। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের মাল (ধার) নেয় পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহতায়ালা তা আদায়ের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে তা নেয় বিনষ্ট করার নিয়তে আল্লাহতায়ালা তাকে ধ্বংস করেন।’ -সহিহ বোখারি

এই উম্মত যদি অসীম বরকত এবং প্রচুর কল্যাণ লাভ করতে চায় তাহলে আমাদের সবার দায়িত্ব হলো- খাঁটি তওবা করা, যথাযথ প্রত্যাবর্তন করা, এবং ইসলামি জীবন বিধান অনুসরণ, কোরআন মাজিদের আদেশসমূহ ও নবীর সুন্নতের যা কিছু বিনষ্ট হয়েছে তা সংশোধন করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আমি বলেছি, তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন এবং তিনি তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।’ -সুরা নুহ : ১০-১২

বরকত অবতীর্ণ হওয়ার অন্যতম মাধ্যম হলো- নবী কারিম (সা.)-এর ওপর সর্বদা দরুদ পাঠ করা। আল্লাহকে ভয় করুন এবং সমস্ত লেনদেন ও জীবনের সব বিষয়ে আল্লাহর দেওয়া পদ্ধতি ও রাসুলের নির্দেশনা মেনে চলুন। তাহলে আপনাদের ওপর বরকত নেমে আসবে, যাবতীয় কল্যাণ ব্যাপকভাবে আচ্ছন্ন করবে এবং তিনি আপনাদের জন্য দুনিয়ার যাবতীয় কল্যাণের রাস্তা খুলে দেবেন।

৫ জানুয়ারি শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান

spot_imgspot_img

ইতালিপ্রবাসীদের জন্য সুখবর দিল ভিএফএস

ভিএফএস গ্লোবালের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে ভিএফএস গ্লোবাল। এবার তারা ইতালিপ্রবাসীদের জন্য সুখবর নিয়ে এসেছে। ভিএফএস তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেজের মাধ্যমে...

জেলখানার চিঠি বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাস  কয়েদি নং: ৯৬৮ /এ  খুলনা জেলা কারাগার  ডেথ রেফারেন্স নং: ১০০/২১ একজন ব্যক্তি যখন অথই সাগরে পড়ে যায়, কোনো কূলকিনারা পায় না, তখন যদি...

কর্মসৃজনের ৫১টি প্রকল্পে নয়ছয় মাগুরায়

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ের ৫১টি প্রকল্পের কাজে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পে হাজিরা খাতা না...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here