Saturday, July 13, 2024

যত্ন নিন মানসিক স্বাস্থ্যেরও

অর্থভুবন প্রতিবেদক

প্রতি বছরের মতো এবারও ১০ অক্টোবর পালিত হবে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘মানসিক স্বাস্থ্য একটি সর্বজনীন মানবাধিকার’। এখানে বলা হচ্ছে মানসিক রোগমুক্ত থাকাই শুধু নয় মানসিক স্বাস্থ্যের সমৃদ্ধি এবং সুরক্ষাও একটি সর্বজনীন মানবাধিকার। মানসিক সুস্থতা আমাদের সামগ্রিক সুস্থতা এবং সমৃদ্ধির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমরা নিজেরাই আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেই সবচেয়ে কম। আমি যেখানে নিজেই আমার অধিকার সম্পর্কে সচেতন নই সেখানে কীভাবে আমার অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করব। কাজেই সব সংস্কার, সব কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে নিজেকেই মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং এ ব্যাধির চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করে মানসিক স্বাস্থ্যের সমৃদ্ধির জন্য অগ্রণী হতে হবে।

প্রথম কথা হচ্ছে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সমাজে প্রতিটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সর্বোচ্চ সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এ অধিকার আমাদের নিশ্চিত করতে হবে প্রতিটি স্তর থেকে। অর্থাৎ, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র থেকে মানসিক স্বাস্থ্যে সুরক্ষার এ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমাদের কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে। এর প্রধান কিছু ইস্যু বা বিষয় হচ্ছে-

যেসব বিষয় আমার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ সেসব বিষয় থেকে মানসিক স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়। মানসিক রোগী তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। শুধু মানবাধিকারই নয় তারা সামাজিক, অর্থনৈতিক, চাকরি ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে তাদের প্রাপ্য অধিকার পান না এবং বৈষম্যের স্বীকার হন।

মানসিক রোগের বাইরে গিয়ে শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের সমৃদ্ধির কথা যদি ধরি তবে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং বিকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে মুক্ত চিন্তার পথকে রুদ্ধ করা, মানুষের প্রাকৃতিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা। কিন্তু আবার এ কথাও মনে রাখতে হবে, চিন্তার মুক্তি চিন্তার স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, আমি যা ইচ্ছা তা-ই প্রকাশ করব। মুক্ত চিন্তাকে, চিন্তার স্বাধীনতাকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে যে, সে যেন অন্যের চিন্তাকে আহত না করে; অন্য গোষ্ঠীর ও অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা, সংস্কৃতিকে আঘাত না করে। অর্থাৎ এ মুক্ত চিন্তার বিকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তি পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সহমর্মিতা হচ্ছে প্রধান শর্ত। মানসিক স্বাস্থ্যকে সুন্দর রাখতে হলে আমাদের মৌলিক অধিকার অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোর প্রাপ্যতা এবং যথাযথ প্রয়োগের নিশ্চয়তা বিধান জরুরি।

বর্তমান বিশ্বে প্রতি আটজনে একজন কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। একই সঙ্গে মানসিক সমস্যা শিশু-কিশোরসহ যুবক জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, হতাশা ইত্যাদি। ফলে সুন্দর সুস্থ এবং উন্নত মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নের দিকে অধিক মনোযোগ দিতে হবে। বিশ্বায়নের চাপ মোকাবিলায় তাদেরকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। পারিবারিক, সামাজিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে শিশু-কিশোরদের মুক্ত-স্বাধীন চিন্তা তাদের নির্ভয়ে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে হবে এবং এটা প্রতিটি শিশু-কিশোরের মৌলিক এবং মানবিক অধিকার। শিশুর মানসিক বিকাশ, মানসিক স্বাস্থ্যের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হলে কিছুতেই আপনি উন্নত মনের, সুস্থ মনের পরিণত মানুষ, উন্নত জাতি আশা করতে পারেন না। ফলে উন্নত মননশীল বিশ্ব, সমৃদ্ধশালী মানবিক জাতি তৈরি করতে গেলে মানসিক স্বাস্থ্যকে একটি সর্বজনীন মানবাধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং এর বাস্তবায়নের জন্য কাজ করার কোনো বিকল্প নাই।

মানসিক স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের সঙ্গে সঙ্গে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতার জন্য একটি সহজলভ্য, উন্নত সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা। যখনই আমি কোনো মানসিক সমস্যায় বা রোগে আক্রান্ত হব সব সংস্কার, কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে আমার দায়িত্ব যেমন সেবা চাওয়া তেমনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হচ্ছে আমার সেবা পাওয়া নিশ্চিত করা। এ সেবা পাওয়ার অধিকার একই সঙ্গে আমার মৌলিক এবং মানবিক অধিকার। আমাদের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবই এ প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত। এ মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তিরা যাতে কোনোভাবেই নিজেদের সমাজের বোঝা না ভাবে সেভাবেই তার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক বিভিন্ন কাজকর্মে, উৎসবে-অনুষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত এবং স্বাগত জানাতে হবে। তার উপযুক্ত কর্ম পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যদি সে একেবারেই অক্ষম হয় তবে তার সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।

অর্থাৎ, সব কথার মূল কথা হলো আমরা আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য যতটা তৎপর চেষ্টা তদবির করি, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যও আমাদের সমানভাবে সচেষ্ট হতে হবে। মনে রাখতে হবে মানসিক স্বাস্থ্য যেমন আমার মৌলিক অধিকার একই সঙ্গে সেটা আবার সর্বজনীন মানবাধিকার। এ অধিকার সুনিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই আমরা একটা সুন্দর, স্বাস্থ্যকর এবং উৎপাদনশীল জীবন কাটাতে পারি।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি), জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, শের-ই-বাংলা নগর, ঢাকা।

 

 
 
 
 
 
spot_imgspot_img

দেশ্যম ইউরো থেকে বিদায়ের দায়ভার নিজের কাঁধে নিলেন

ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশ্যম দলের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা আঁতোয়ান গ্রিজম্যানদের ব্যর্থতাকে ইউরোপীয়ান চ্যাম্পিয়নশীপের সেমিফাইনাল থেকে বিদায়ের জন্য দায়ী করেননি। স্পেনের কাছে ২-১ গোলে...

বুয়েটের শিক্ষার্থীরা ‘উচ্ছ্বসিত’ টগি ফান ওয়ার্ল্ডের লেজার ট্যাগে

টগি ফান ওয়ার্ল্ড থিম পার্কে সম্প্রতি আন্ত বিভাগ ‘লেজার ট্যাগ’  টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ২০২৩ সালের ব্যাচ। গত বুধবার ঢাকার বসুন্ধরা...

সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস হেরে গেছেন

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস এবারের নির্বাচনে হেরে গেছেন। ২০১০ সাল থেকে এমপি থাকা ট্রাস ইংল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলীয় নরফোক সাউথ ওয়েস্ট নির্বাচনী এলাকায় লেবারদের কাছে ৬৩০...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here