Wednesday, July 24, 2024

ডিজিটাল সেবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে আন্তরিক প্রয়াস কাম্য

অর্থভুবন প্রতিবেদক

সরকারি পরিষেবায় সবার সুযোগ নিশ্চিত করা আধুনিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সরকারি সেবা ও পরিষেবা অনেক ক্ষেত্রেই পশ্চাৎপদ খাত হিসেবে টিকে থাকে। যেন নামেমাত্র টিকে থাকাই তাদের অস্তিত্বের সারবত্তা। গত কয়েক দশকে আমাদের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ আধুনিক প্রযুক্তি ও সম্ভাবনার পুরো সুযোগ ঘরে তুলতে পারেনি। ইন্টারনেটের ছোঁয়ায় প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে পুরনো ডাকঘরের ডাক বাক্সের ব্যবহার। ডাক বাক্স তার অতীতের জৌলুস হারালেও সারা দেশে স্মৃতির বাক্স হিসেবে টিকে আছে পোস্ট অফিস। প্রতি বছর ডাক বিভাগে নিয়োগ হয় জনবল। সরকার থেকে প্রতি বছর ডাক বিভাগের জন্য দেয়া হয় আলাদা বরাদ্দ। তার পরও সেবার মানের দিক থেকে বেসরকারি সেবা খাতের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে ডাক বিভাগ। তৃণমূল পর্যন্ত ব্যাপৃত এ অবকাঠামো দিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে অনেক জরুরি সেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভবপর হলেও তা বাস্তবে রূপ পাচ্ছে না। 

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ডিজিটাল বাংলাদেশের সেবা পৌঁছে দিতে ২০১২ সালে ‘পোস্ট ই-সেন্টার ফর রুরাল কমিউনিটি’ প্রকল্প নেয় সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ মানুষকে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, ইন্টারনেট সুবিধাসহ অন্যান্য ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করা। তবে এক দশক পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির যথাযথ বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। এমনকি সারা দেশে একটি বড় অংশে এখনো ‘পোস্ট ই-সেন্টার’-এর কার্যক্রম শুরুই করা সম্ভব হয়নি। প্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেবাটির বিষয়ে সাধারণ মানুষ এখনো ঠিকঠাক জানে না। প্রকল্পটি নেয়ার ক্ষেত্রে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন না করা এবং বাস্তবায়নের পর যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবে এটি লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে ৫৪০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে পোস্ট ই-সেন্টার প্রকল্পটি নেয় সরকার। এর আওতায় জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে ৮ হাজার ৫০০ পোস্ট অফিসকে পোস্ট ই-সেন্টারে রূপান্তর করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেয়া, রেমিট্যান্স প্রাপ্তিতে সহায়তা, ডাকঘরকে ডিজিটালাইজড, কৃষি স্বাস্থ্য ও সেবা বিষয়ে তথ্য সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কমার্শিয়াল পোস্টাল সার্ভিসের সূচনা, আইটিভিত্তিক পল্লী উদ্যোক্তা তৈরি, ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার এবং পোস্টাল ক্যাশ কার্ড সার্ভিসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তবে এত বছর পার হয়ে গেলেও প্রকল্পটির উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। 

সরকারি পরিষেবা যেখানে খাবি খাচ্ছে সেখানে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিস দাপটের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে এবং সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে সর্বস্তরের গ্রাহকদের মন জয় করেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিশ্বের ডাকসেবার মান যেখানে উন্নত হয়েছে সেখানে আমরা পিছিয়েছি। আগে যে সংখ্যক লোক ডাক বিভাগের সেবা গ্রহণ করত এবং এখন যে পরিমাণ লোক করে তার পার্থক্য খতিয়ে দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। 

ডাক বিভাগের আস্থা, পৌঁছানো, প্রাসঙ্গিকতা ও সহনশীলতা এ চার সূচকের ওপর ভিত্তি করে সারা বিশ্বের দেশগুলোর ডাক বিভাগের স্কোর ও ধাপ নির্ণয় করে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন (ইউপিইউ)। ইউপিইউর প্রকাশিত সমন্বিত ডাক উন্নয়ন সূচক র‌্যাংকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ১৭২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩৩তম। আর স্কোর ছিল ১৩.৯০। ২০২৩ সালে ১৭২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৯তম। স্কোর ১৮.৩০। উন্নয়ন সূচকের র‌্যাংকিং অনুযায়ী অনেক দেশের পেছনে পড়েছে বাংলাদেশের ডাক বিভাগ। 

প্রান্তিক ডাকঘরগুলো পরিদর্শন করলে হতাশার চিত্রই ভেসে উঠবে। সারা দেশে অনেক পোস্ট ই-সেন্টারের অবকাঠামো অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। অপ্রতুল যেমন আসবাবপত্র, তেমনি প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সরঞ্জামেও রয়েছে সংকট। যে কারণে কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা প্রচার-প্রচারণার অভাব। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো কিছুই জানে না। 

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৯৬টি পোস্ট অফিসে পোস্ট ই-সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হলেও এখন প্রায় ২০০ কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি এ জেলার অধিকাংশ ই-সেন্টারও বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। কম্পিউটার বিকলের পাশাপাশি নিজস্ব পোস্ট অফিস না থাকায় জেলার ত্রিশাল উপজেলার গফাকড়ি পোস্ট অফিসে এ সেবা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ত্রিশালের বাগান পোস্ট অফিসেও একই দশা। 

পোস্ট ই-সেন্টার প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে পরিকল্পনার অভাব ও অব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। এটি বাস্তবায়নকালে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হিসেবে ল্যাপটপের সঙ্গে বিল্ট ইন ক্যামেরা সংযুক্ত থাকলেও কেনা হয় অতিরিক্ত ৮ হাজার ৫০০ ওয়েব ক্যামেরা। সেন্টারগুলোর জন্যও কেনা হয় বাড়তি ৮ হাজার ৫০০ প্রিন্টার। প্রয়োজন না থাকলেও ৫০০টি অতিরিক্ত হার্ড ডিস্ক কেনা হয়। এসব যন্ত্রপাতি কিনতে খরচ হয় ৭ কোটি ৮১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বাংলাদেশ মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) এক অডিট প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পোস্ট ই-সেন্টার প্রকল্প বাস্তবায়নে যেসব পণ্য কেনা হয়েছে, এর প্রয়োজনীয়তা ছিল না। 

সারা দেশে ৯০০ পোস্ট ই-সেন্টারে নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে সিএজি। অডিটকালে দেখা যায়, এসব সেন্টারের ২০ শতাংশ যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। সেন্টারগুলোর ৭০ শতাংশ আসবাবপত্রের কোনো অস্তিত্বই পায়নি সিএজি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোস্টাল সেভিংস ব্যাংক ও পোস্টাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কার্যক্রম প্রসারিত করা, পল্লী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং জনপ্রিয় করা, ভাতা বিতরণ, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরি, পল্লী জনগোষ্ঠীর মধ্যে রেমিট্যান্স সেবা প্রসার, শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেয়ায় ব্যর্থ হয়েছে সেন্টারগুলো। সেন্টার স্থাপনের পর প্রকল্পের উদ্দেশ্য অর্জন যাচাই করতে মনিটরিংও করেনি ডাক বিভাগ।

চট্টগ্রামের পোস্ট ই-সেন্টারের একাধিক উদ্যোক্তা জানান, ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা না থাকায় এখনো শতভাগ মানুষের কাছে পোস্ট ই-সেন্টারের তথ্য পৌঁছেনি। সেজন্য সরকারের এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন হয়নি। ইকুইপমেন্টসের স্বল্পতা, স্থায়ী অফিস না থাকায় মানুষের কাছে সেবা নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে বলেও জানান এসব উদ্যোক্তা। 

যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজনেও পরিবর্তন এসেছে। এখন হয়তো মোবাইল ফোন কিংবা কম্পিউটারে পত্র যোগাযোগের কাজ সারা হচ্ছে কিন্তু জরুরি নথি, বিভিন্ন পণ্য ও পার্সেল পরিবহনের চাহিদা বাড়ছে। এ পরিষেবায় দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও প্রতিযোগিতা দুটোই বেড়েছে। বিশেষ করে ই-কমার্সের রমরমা অবস্থার কারণে পার্সেল ও ডেলিভারি এখন প্রয়োজনীয় সেবা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এসব সেবার ক্ষেত্রে প্রেরকের কাছ থেকে চিঠি বা পার্সেল সংগ্রহ করে প্রাপকের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। কারণ শহুরে জীবনে ট্রাফিক ঠেলে কেউই কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পণ্য পাঠাতে এখন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। কিন্তু ডাক বিভাগের সে নীতি নেই। কেউ কিছু পাঠাতে চাইলে তাকে ডাকঘরে যেতে হবে। এ বিষয়ে ডাক বিভাগের কর্তারা বলেন, ডাক বিভাগের নীতি অনেক পুরনো। চাইলেই একদিনে কোনো কিছু পরিবর্তন সম্ভব নয়।

এখনো ডাক বিভাগ গ্রাহকের কাছে অনেক সেবা নিয়ে যেতে পারে। এজন্য ডাক বিভাগকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে হবে এবং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পরিষেবা নির্ধারণ করতে হবে। কাগজে-কলমে সেবা রাখাতেই দায়িত্ব সেরে ফেলার প্রয়াস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বেসরকারি খাতের ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিলেই গ্রাহক চাহিদা ও সেবার পরিসর নিয়ে নীতিনির্ধারকরা ধারণা পেতে পারেন। যুগের প্রয়োজনে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের জন্য সেবায় বৈচিত্র্য আনা ও নতুন নতুন সেবা চালু করা জরুরি। 

 

 

spot_imgspot_img

ইস্ট আম্বার চাল সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক

বর্ষার সময় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে আদি চালের বাইরে সাদা সাদা ইস্ট জমে। এটা মূলত প্রাকৃতিক ইস্ট। যা পাউরুটিকে নরম তুলতুলে...

দক্ষ জনশক্তি গড়তে ১১৭ কোটি টাকা দিল কোইকা

নিজস্ব প্রতিবেদক,অর্থভুবন দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে বাংলাদেশকে ১১৭ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা দিয়েছে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কোইকা)। গতকাল বুধবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান...

বাকিংহাম প্যালেস : এবার ব্যালকনির পেছনের ঘরটি দেখার সুযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক,অর্থভুবন বিশেষ বিশেষ দিনে বা ঘটনার ক্ষেত্রে বাকিংহাম প্যালেসের ব্যালকনি থেকে দেশবাসীর সামনে দেখা দিয়ে থাকেন রাজা বা রানিসহ ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যরা। সে কারণে...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here